Lamiya khan lamha

Lamiya khan lamha

Share

আসসালামু আলাইকুম,
"ভালোবাসা, কষ্ট, আবেগ,টানাপোড়েনে গড়া শব্দের জগতে আপনাকে স্বাগতম জানাই আমি
(লামিয়া খান লামহা)

17/06/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না

#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা
#পর্ব_১৫

⭕কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ 🚫❌

পরদিন সকালে পূর্ব আকাশে সোনালি সূর্য উঠেছে। চারপাশে কোলাহলও বেড়ে গেছে। খানবাড়ির সবাই সকালের নাস্তা সেরে নিয়েছে।

কবির খানসহ বাড়ির কয়েকজন যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। আনিকা আর ইশান যাবে ভার্সিটিতে। রেজা খান টিয়ানকে মাদরাসায় পৌঁছে দিয়ে হিয়া ও রাহাকে নিয়ে হোস্টেল থেকে তাদের জিনিসপত্র আনতে যাবে। বাড়ির বাকি পুরুষেরা যে যার অফিসে চলে যাবে। এভাবেই সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দিল।

মাঝখানে কেটে গেছে চারটি দিন।

কবির খানরা গতকালই যশোর থেকে ফিরে এসেছেন। হিয়া আর রাহার পড়াশোনার কথা ভেবে সেদিন বিকেলেই রেজা খান তাদের জন্য একজন প্রাইভেট টিউটর ঠিক করে দিয়েছেন। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত বরকত স্যার এসে তাদের পড়িয়ে যান।

এলাকায় বরকত স্যারের বেশ সুনাম রয়েছে। মধ্যবয়সী হলেও তিনি খুব ভালো পড়ান। তাঁর পড়ানো থেকে পরীক্ষায় অনেক প্রশ্ন কমন পড়ে। তাই অভিভাবকদের কাছেও তাঁর কদর কম নয়।

আজ শুক্রবার।

আর কয়েকদিন পরেই হিয়া আর রাহার ফাইনাল পরীক্ষা। হাতে খুব বেশি সময় নেই। তাই বরকত স্যার জানিয়েছিলেন, শুক্রবারও সকালে এসে তাদের পড়াবেন। সময় ঠিক হয়েছিল সকাল নয়টা থেকে দশটা পর্যন্ত। যথারীতি তিনি ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছুঁতে পাঁচ মিনিট বাকি থাকতেই খানবাড়িতে হাজির হলেন।

ড্রইংরুমে বসে হিয়া আর রাহাকে পড়াচ্ছেন তিনি। ইংরেজি শেষ করে এখন আইসিটির কিছু ম্যাথ সমাধান করতে দিয়েছেন।

রাহা মনোযোগ দিয়ে ম্যাথ করলেও হিয়ার মন অন্যদিকে। সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।

বুড়ো মানুষটা বলেছিল দশটা পর্যন্ত পড়াবে। অথচ এখন দশটা দশ বেজে গেছে! তবুও ছুটি দিচ্ছে না কেন?

এতক্ষণ বসে থাকতে থাকতে তার পা ব্যথা হয়ে গেছে। খিদেও পেয়েছে। আর ম্যাথ তো এমনিতেই তার মাথায় ঢুকতে চায় না।

হিয়াকে অন্যমনস্ক দেখে বরকত স্যারের বিরক্তি বাড়ছিল। মেয়েটাকে বারবার বুঝিয়েও যেন কিছুই বোঝানো যায় না। উপরন্তু পড়ার সময় মনোযোগও থাকে না।

রাগ চেপে রাখতে পারলেন না তিনি।

নেহাত খানবাড়ির মেয়ে বলেই কিছু বলেননি এতক্ষণ। অন্য কেউ হলে হয়তো কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন।

কঠোর চোখে হিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু হিয়ার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে নিজের ভাবনায় ডুবে আছে।

খাতার দিকে তাকিয়ে বরকত স্যার দেখলেন, ম্যাথের খাতা একপাশে সরিয়ে রাখা।

এবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।

তিনি গলা চড়িয়ে বললেন,

— এই হিয়া! পচা মেয়ে! সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছো কেন? ম্যাথ করা হয়েছে? আজও যদি ম্যাথ না হয়, তাহলে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব।

হিয়া চমকে উঠল।

তাদের বাড়িতে এসে তাকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে!

একেই ম্যাথ মাথায় ঢুকছে না, তার ওপর সবার সামনে এমন অপমান!

চোখে পানি চলে এল তার।

মিনমিন করে বলল,

— সরি স্যার।

পাশে বসে রাহা মিটিমিটি হাসছে। বরকত স্যার যে কতক্ষণ ধরে হিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেটা দেখেই সে কনুই দিয়ে বারবার খোঁচাচ্ছিল। কিন্তু হিয়া নিজের জগতেই হারিয়ে ছিল।

এদিকে লিপি বেগম রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। বরকত স্যারের ধমক শুনে থমকে দাঁড়ালেন।

মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল স্কুলজীবনের কথা।

লেখাপড়ায় ভালো হলেও গণিতে তিনি ভীষণ কাঁচা ছিলেন। কতবার যে সবার সামনে কান ধরে উঠবস করতে হয়েছে!

পুরোনো সেই লজ্জাজনক স্মৃতি মনে পড়তেই রান্নাঘরে না গিয়ে গুটিগুটি পায়ে সেখান থেকে সরে গেলেন।

আরও প্রায় বিশ মিনিট পড়ানোর পর অবশেষে বিদায় নিলেন বরকত স্যার।

তিনি যেতেই টিয়ান এসে হাজির।

গতকাল সন্ধ্যায় রাজ গিয়ে তাকে নিয়ে এসেছে।

এসেই বলল,

— মেজ আপু, তোমাকে ওই ভালো লোকটা বকা দিল কেন?

হিয়া ভুরু কুঁচকে বলল,

— কখন বকা দিল?

টিয়ান বিজয়ী হাসি দিয়ে বলল,

— আমি শুনেছি! ওই ভালো লোকটা তোমাকে পচা মেয়ে বলেছে। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে বলেছে। আমি সবাইকে বলে দেব তুমি পড়া পারো না।

হিয়া চোখ রাঙিয়ে বলল,

— তোরে দাঁড়া! আমাকে নিয়ে মজা নিচ্ছিস!

বলেই টিয়ানের পেছনে দৌড় দিল।

নিজেকে বাঁচাতে টিয়ান ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে তার মেজ মায়ের পেছনে লুকাল।

তাদের কাণ্ড দেখে রাহা হাসতে হাসতে ডিভানে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

হাসি থামিয়ে বলল,

— কিরে পচা মেয়ে!

হিয়া এসে তার পাশে বসে বলল,

— থামবি তুই?

রাহা আবার হেসে বলল,

— থামব কেন? স্যার সামনে বসে থাকার পরও তুই সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলি কেন? কার কথা ভাবছিলি?

— আরে কারও কথা না! আমি তো শুধু সময় দেখছিলাম। দেখলি না, পাক্কা ত্রিশ মিনিট বেশি বসিয়ে রেখেছে? পা ব্যথা করছিল, খিদেও পেয়েছিল।

— তাই বলে এমন ভাবনায় ডুবে গেলি? ওরে আমার ভাবনার রানী! সামনে যে পরীক্ষা, সেটা নিয়েও একটু ভাব!

হিয়া মুখ ফুলিয়ে বসে রইল।

রাহা হেসে বলল,

— আচ্ছা থাক, আর কষ্ট পেতে হবে না। চল, কিছু খেয়ে আসি।

দুজন বই-খাতা গুছিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল।

আনন্যা বেগম তাদের জন্য নুডলস আর ডিম পোচ করে রেখেছিলেন। তাই দুজন মনের আনন্দে খেতে শুরু করল।খাওয়ার মাঝেই ইশান এসে রাহার পাশের চেয়ার টেনে বসল। স্বভাবমতো রাহার চুল টেনে দিয়ে বলল,

— কিরে পাখি, লেখাপড়া নিয়ে দেখছি আজকাল বেশ সিরিয়াস হয়ে গেছিস!

রাহা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— হ্যাঁ। ভালো রেজাল্ট করে আনিকার বাবাকে দেখিয়ে দেব।

ইশান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আনিকার বাবা, তোর বাবা না নাকি?

— না।

— এখনও মেজ বাবাইয়ের ওপর রাগ করে আছিস?

হিয়া হেসে বলল,

— বুঝলে ভাইয়া, আনি আপুর বাবা আমাদের রাহু পাখির খালু লাগে!

ইশান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— চুপ পচা মেয়ে! চুপচাপ খা।

নিজের বড় ভাইয়ের মুখে ‘পচা মেয়ে’ শব্দটা শুনে হিয়ার মুখ মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। তার মানে বরকত স্যার তাকে বকা দিয়েছেন— এই খবর বাড়ির সবাই জেনে গেছে!

রাগে আর অপমানে গাল দুটো ফুলিয়ে ফেলল সে। মনে মনে বরকত স্যারকে কয়েকটা গালিও দিল।

কথা বলতে বলতেই দুজনের খাওয়া শেষ হয়ে গেল।

খাওয়া শেষ হতেই ইশান তাড়া দিয়ে বলল,

— এখন তাড়াতাড়ি চল। সবাই তোদের জন্য অপেক্ষা করছে।

রাহা অবাক হয়ে বলল,

— কোথায় যাব?

— তাজ ভাইয়া আমাদের সব কাজিনকে ডেকেছে।

হিয়া উত্তেজিত হয়ে বলল,

— নিশ্চয়ই বিদেশ থেকে আনা গিফট দেবে! তাই ডেকেছে।

ইশান বিস্মিত হয়ে বলল,

— তুই জানলি কীভাবে?

হিয়া গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,

— আরে, আন্দাজে বলেছি। দেখনি, কত বড় বড় লাগেজ নিয়ে এসেছে? আমি শিওর, ওর মধ্যে আমাদের জন্য অনেক গিফট আছে।

রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— গিফট না, ওগুলো ঘুষ হবে। তোদের ঘুষ দেবে!

ইশান সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিল,

— চুপ কর পাখি। কেউ শুনে ফেললে কষ্ট পাবে। এখন চল।

---

বাড়ির পাশের বড় আমগাছটার ছায়ায় পাটি বিছিয়ে সবাই বসে আছে।

তাজ একে একে সবার হাতে তাদের জন্য আনা উপহারগুলো তুলে দিচ্ছে।

ঘড়ি, ট্যাব, ল্যাপটপ, সানগ্লাস, মেকআপ বক্স, চকলেট, পারফিউম, তেল, সাবান, শ্যাম্পু, লোশন— সবই নামি ব্র্যান্ডের।

আর টিয়ানের জন্য তো খেলনার পাহাড়!

সবাইকে উপহার দেওয়া শেষ করে তাজ হেসে বলল,

— দেখো গাইস, তোমাদের কার কী পছন্দ, সেটা আমরা কেউই জানতাম না। তাই মমের পছন্দমতো জিনিস এনেছি। আশা করি, এই ছোট্ট গিফটগুলো তোমাদের ভালো লাগবে। সেদিন ব্যস্ততার কারণে দেওয়া হয়নি।

একটু থেমে আবার বলল,

— আর আজ বিকেলে আমরা সব কাজিন মিলে অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ঘুরতে যাব। সবাই রাজি তো?

ছোটরা সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল।

তবে আনিকার মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও সে কিছু বলল না।

কিন্তু রাহা সরাসরি বলে দিল,

— আমি যেতে চাই না। সামনে পরীক্ষা। ঘোরাঘুরির সময় নেই আমার।

হিয়ারও যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু রাহা যাবে না শুনে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

রাজ তখন মোবাইল থেকে মুখ তুলে বলল,

— ফোন নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় আছে, কিন্তু ভাইবোনদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার সময় নেই? হাউ ফানি!

তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,

— সামনে পরীক্ষা বলে এত চাপ নেওয়ারও কিছু নেই। সারা বছর ঠিকমতো পড়াশোনা করলে পরীক্ষার আগে এত টেনশন করতে হতো না।

রাজের কথা শুনে রাহার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।

লোকটা কি বলতে চাইছে, সে সারা বছর পড়াশোনা করেনি?

রাগে দাঁত চেপে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— হিয়া, তুই যেতে চাস অ্যামিউজমেন্ট পার্কে?

হিয়া মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

— হ্যাঁ! রাহু পাখি, চল না। আরে বাবা, কয়েক ঘণ্টারই তো ব্যাপার। তেমন কোনো সমস্যা হবে না।

রাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— ব্যাস! হিয়া তো যেতে চাইছে। ওর সমস্যা না হলে তোমারও হওয়ার কথা না। সো, ফাইনাল— আমরা বিকেলে ঘুরতে যাচ্ছি।

রাহা রাগে ফুঁসতে লাগল।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত চেপে বলল,

— ওকে। আর কিছু বলবেন না। এখন নিশ্চয়ই যেতে পারি?

রাজ শান্ত গলায় বলল,

— না, পারো না। আগে তোমার গিফটগুলো নিয়ে যাও।

রাহা এক ঝটকায় নিজের উপহারগুলো হাতে তুলে নিল
তারপর হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল। গিফট নেওয়ার কোনো ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু এখন এইগুলো না নিলে আবার বলবে তাদের আপমান করছে। তার মহত মাও তার কানের কাছে এসে বকবক শুরু করবে।তা ছাড়া বড় বাবাই আর বড় মাও কষ্ট পাবে।তাই সব নিলো সে।

যেতে যেতে তার ভীষণ রাগ হচ্ছিল হিয়ার ওপর।

হিয়ার বাচ্চাটা অন্তত তার পক্ষ নিয়ে বলতে পারত— তারা যাবে না।

কিন্তু না!

এখন তো খুব খুশি।

একটু পর যখন ম্যাথ বুঝতে আসবে, তখনই সে হিয়াকে ভালো করে মজা বুঝিয়ে দেবে।

---

রাহা চলে যেতেই একে একে সবাই নিজেদের রুমের দিকে যেতে লাগল।

আনিকাও নিজের গিফট নিয়ে চলে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই তাজ ডাকল,

— আনিকা...!

আনিকা থেমে গেল।

এই ছেলেটার মুখে নিজের নাম শুনলে কেন যেন তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।

নিজেকে সামলে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,

— জি ভাইয়া, বলুন।

তাজ বলল,

— মম, মেজ মা, পাপিয়া, ছোট মা— সবাইকে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে দিও। যদি যেতে চান, তাহলে যেন বিকেল চারটার আগেই রেডি থাকেন। আমরা ঠিক চারটায় বের হব।

আনিকা মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা ভাইয়া, বলে দেব।

কথা শেষ করে সে ধীরে ধীরে চলে গেল।

আর তাজ আগের মতোই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

কেন যেন মেয়েটা চলে যাওয়ার পরও তার দৃষ্টি সেদিকেই আটকে রইল।

প্রায় এক মিনিট পর তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "সাথী"।

গতকাল যশোর থেকে ফিরে এসেই সাথীর সঙ্গে দেখা করেছিল সে। শপিংও করিয়েছে।

প্রিয় মানুষটার নাম দেখতেই তাজের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

মুহূর্তেই কল রিসিভ করে ডুবে গেল আপন মানুষটার সঙ্গে কথোপকথনে।

#চলবে

16/06/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না

#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা

#পর্ব_১৪

⭕ কপি করা কঠোরভাবে নিষেধ 🚫❌

---

রাত আটটা।

কয়েক মিনিট আগেই আনিকার ঘুম ভেঙেছে। দুপুরে ঘুমিয়েছিল, আর এখন উঠে বেশ হালকা লাগছে শরীর। আগের তুলনায় জ্বরও কিছুটা কমেছে।

ফ্রেশ হয়ে প্রথমেই রাহার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল সে।

দরজা বন্ধ।

হালকা টোকা দিয়ে বলল,

— বনু, দরজাটা খুল না। এখনও কি আমার ওপর রাগ করে আছিস? আই'ম সরি... সব ভুল আমার। এবার দরজাটা খোল।

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।

আনিকা আবার বলল,

— খুলবি না তুই? আচ্ছা, আমি তাহলে চলে যাচ্ছি।

আর কিছু বলার আগেই দরজাটা খুলে গেল।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাহাকে দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল আনিকার। অতিরিক্ত কান্নার কারণে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।

আনিকা কিছু বলার আগেই রাহা নিজের কান ধরে বলল,

— সরি আপু। আমি ইচ্ছে করে তোকে আঘাত করিনি। আমাকে ক্ষমা করে দে।

আনিকা ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল।

— করব না ক্ষমা।

রাহা হতভম্ব হয়ে গেল।

— কেন?

— কারণ তুই প্রতিবার একই কথা বলিস। তারপর আবার আমাকেই কষ্ট পেতে হয়।

মুহূর্তেই রাহার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
সত্যিই তো...প্রতিবার সে ভুল করে, প্রতিবার আনিকার মন ভাঙে, আর প্রতিবারই সে এসে ক্ষমা চায়।
এভাবে বারবার ক্ষমা চাওয়ারও তো একটা সীমা আছে।

আনিকা মনে মনে হেসে উঠল।

তারপর বলল,
— কী দাঁড়িয়ে আছিস? একটা কাজ করলে কিন্তু তোকে ক্ষমা করে দিতে পারি।

রাহার চোখ জ্বলে উঠল।

— কী কাজ?

— আমাকে ছুঁয়ে কথা দে, হোস্টেলে যাওয়ার জন্য আর জেদ করবি না।

রাহা ভ্রু কুঁচকাল।আনিকা শান্ত গলায় বলতে লাগল,

— আরে, বাবা! কয়দিন পর তো এমনিতেই হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাবে। এখন গিয়ে করবিটা কী?
তুই নিজেই তো বলিস, বাড়ির বাইরে আমাদের শত্রুর অভাব নেই। তাহলে তুই কেন বাড়ির বাইরে থাকতে চাইছিস? তুই চলে গেলে হিয়াটাও তোর পিছু ছুটবে।
এতদিন প্রয়োজন ছিল বলে থেকেছিস। এখন বাড়ি ফিরে আয়।
তুই তো বাড়ি থেকে কোনো টাকাও নিস না। নিজের খরচ নিজেই চালাস। এ নিয়ে মা-বাবাও তোকে কিছু তো বলে না।তাহলে সমস্যা কোথায়ে।

রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— কে বলল কিছু বলে না? তোর বাবা আজ আমাকে টাকার খোঁটা দিয়েছে।

আনিকা অবাক হয়ে গেল।
রাহা কখনো মিথ্যা বলে না।
তাহলে সত্যিই কি বাবা এমন কিছু বলেছেন?
মনে মনে ঠিক করল পরে বাবার সঙ্গে কথা বলবে।
তবু মুখে বলল,

— রাগের মাথায় হয়তো বলে ফেলেছে। বড়দের সব কথা ধরতে নেই। তুই বাড়ি ফিরে আয়।

রাহা তিক্ত হেসে বলল,
— এখন বাড়ি ফিরে আসতে বলছিস কেন?
ছোটবেলায় যখন তোর বাবা আমাকে জোর করে হোস্টেলে দিয়ে আসত, তখন আমার কান্নার কোনো দাম ছিল না।
তখন যেতে চাইতাম না, জোর করে পাঠাত। আর এখন আসতে চাইছি না, জোর করে নিয়ে আসতে চাইছে।
আমাকে কাঠের পুতুলের মতো নাচাচ্ছে তোর বাবা।

আনিকা চুপ করে গেল।রাহা মিথ্যা বলছে না।সেও তো কতবার বাবাকে বুঝিয়েছে।কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
তবু হার মানল না।

— তখন থেকে তোর বাবা, তোর বাবা করছিস কেন? আমাকে ছুঁয়ে কথা দে, বাড়ি ফিরে আসবি। ভালো রেজাল্ট করে পরে না হয় দূরের কোনো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাস না হয়ে।

রাহা চুপ।
— কী হলো? কথা দে। না হলে কিন্তু আমি তোর সঙ্গে কথা বলব না। তুই তো জানিস, আমি যা বলি তাই করি।

এবারও কোনো উত্তর নেই।
আনিকা মনে মনে ভাবল, তার সব চেষ্টা বুঝি ব্যর্থ হলো।

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে রাহা বলল,
— ঠিক আছে। যাব না।

আনিকার চোখ চকচক করে উঠল।

রাহা আবার বলল,

— কিন্তু তোর বাবাকে আমার সঙ্গে কথা বলতে মানা করবি। আমি ওই লোকটার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। সামনে যেতেও চাই না।

আনিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— এমন কথা বলিস না বনু। উনি আমাদের জন্মদাতা বাবা।

— না। তোর বাবা। আমার কেউ না।

— আচ্ছা। তোকে তাহলে ডাস্টবিনের পাশ থেকে কুড়িয়ে এনেছি আমরা।

— হতেও পারে।

আনিকা আর কিছু বলল না।তার আসল কাজ হয়ে গেছে।মনে মনে আল্লাহর কাছে হাজারবার শুকরিয়া আদায় করল।

তারপর বলল,

— আচ্ছা, এখন নিচে চল। আমার খুব খিদে পেয়েছে।

বলেই রাহার হাত ধরে নিচে নিয়ে গেল।

---

বিকেলেই যশোর থেকে রেখা বেগমের বড় ভাই আর ভাবি এসেছেন।

তাঁরা এসেছেন একটা বিশেষ অনুরোধ নিয়ে।

রেখা বেগমের বৃদ্ধা মা বেশ অসুস্থ। তিনি নাতি-নাতনিদের দেখতে চাইছেন।

তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে, সকালে রেখা বেগম, কবির খান আর তিন ছেলে কয়েক দিনের জন্য যশোর যাবে।

অন্যদেরও যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু বাড়ির বাকিরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত।

কিছুদিন আগেই সবাই মিলে সেখানে গিয়ো রেখা বেগম এর মাকে দেখে এসেছে।

---

ড্রয়িংরুমে দুই পাশে পুরুষ আর মহিলারা বসে গল্পে মেতে উঠেছেন।

সুস্বাদু খাবারের গন্ধে পুরো বাড়ি ম-ম করছে।

আনিকা আর রাহাকে দেখে নুপুর বেগম ডাক দিলেন।
( নুপুর বেগম হলো রেখা বেগম এর ভাইয়ের বউ)

— আরে, আনিকা, রাহা! কেমন আছো তোমরা?

দুজন একসঙ্গে বলল,

— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

— ভালো। তা বিকেল থেকে কোথায় ছিলে? তোমাদের তো দেখলামই না।

আনিকা— আমি ঘুমাচ্ছিলাম, আন্টি।

নুপুর বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,

— অসময়ে ঘুমাবে কেন? এটা একদম ভালো না। চোখের নিচে তো ডার্ক সার্কেল পড়ে গেছে। রাতে ঠিকমতো ঘুমাও না নাকি? সারারাত ফোন নিয়ে পড়ে থাকো?

আনিকা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

মহিলার সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই মনে হয়েছে তিনি অন্যকে ছোট করে কথা বলতে ভালোবাসেন। আর কি ডাহা মিথ্যা কথা বলে দিলো কোই তার চোখের নিচে তো কোনো ডার্ক সার্কেল নেই।

সালমা বেগম হেসে বললেন,

— আসলে আমাদের আনিকা রাত জেগে পড়াশোনা করে। লেখাপড়ায়ও খুব ভালো। ছোটবেলা থেকেই সব পরীক্ষায় প্রথম হয়।

— ওহ্! তা বাড়ির মেয়েদের এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিন।

একটু থেমে আবার বললেন,

— আরও আগে বিয়ে দিলে এতদিনে নাতি-নাতনির মুখও দেখতে পেতেন। বাড়ির মেয়েদের এতো লেখাপড়া করানো ভালো না। কাল গিয়ে কুলে ঠেকেছে,, লেখাপড়া নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায়ে না কোথায়ে যায়ে তার কোনো ঠিকঠিকানা আছে না।

ঘরজুড়ে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।

কথাগুলো কারোরই ভালো লাগল না।

---

রাহা বিরক্ত হয়ে গেল।

এই মহিলার অতিরিক্ত কথা বলা তার একদম সহ্য হয় না।হঠাৎ মুচকি হেসে বলল,

— আন্টি, শুনলাম কয়দিন আগে ঝুমুর আপুর বিয়ে নাকি এক গাঁজাখোরের সঙ্গে ঠিক করেছিলেন?

নুপুর বেগম চমকে উঠলেন।

রাহা থামল না।

— অথচ শুনেছি আপুর কয়েক বছরের রিলেশন আছে। ছেলেটা এমবিএ করছে, ভবিষ্যতে ভালো চাকরিও করবে।তাহলে এমন ছেলেকে বাদ দিয়ে গাঁজাখোরের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলেন কেন?আপনার কি খুব তাড়াতাড়ি নাতি-নাতনির মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে?
তাহলে এমবিএ করা ছেলেটার সঙ্গেই বিয়ে দিয়ে দিন। গরিব হলেও অন্তত গাঁজাখোর না।

নুপুর বেগমের মুখ থমথমে হয়ে গেল।
কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এসেছে।
ঘরের ভেতর চাপা হাসির রোল উঠল।

রেখা বেগমও অবাক হয়ে বললেন,

— ভাবি, রাহা যা বলল, সত্যি?

নুপুর বেগম কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।

শেষ পর্যন্ত বিব্রত হয়ে স্বামীকে নিয়ে গেস্টরুমে চলে গেলেন।

রাহার জবাবে বাড়ির সকলে মনে মনে খুশি হয়েছে। রেখা বেগম কষ্ট পাবে তাই কেউ কিছু বলে নি নুপুর বেগমকে৷

রেখা বেগম এর খারাপ লাগছে।আনিকাকে নিজের ভাবি এমন কথা বলালয়ে। তিনি আনিকাকে বললো-- আনিকা মা তুই কষ্ট পাস না ভাবির কথায়ে। ওনার হয়ে আমি তোর কাছে খমা চাইছি।

আনিকা -- কি বলছো মামুনি৷ ওনার কথায়ে আমি কষ্ট পাইনি। বাহিরে লেকের কথায়ে আমার কষ্ট হবে কেনো। ওনার হয়ে তোমাকে সরি বলতে হবে না।

রেখা বেগম হাসলেন। আনিকা সত্যি আনেক ভালো মনের মেয়ে।
---

আনিকা নিজের মাকে বললো। আম্মু খেতে দাও খুদা লেগেছে।

আনন্য বেগম দূত দুই মেয়েকে খাবার বেরে দিলো। তাজ বাদে বাড়ির কেউ জানে না আনিকার হাত কাটা।

খাবার টেবিলে এসে বসেছে আনিকা আর রাহা।

রাহা ভাত মাখছে।

কিন্তু আনিকা বসে আছে চুপচাপ।

ডান হাতে ব্যান্ডেজ।

খাবে কীভাবে?

হঠাৎ রাহা এক লোকমা ভাত তুলে ধরল তার মুখের সামনে।

— খাচ্ছিস না কেন? খিদে নেই?

আনিকার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

দ্রুত লোকমাটা মুখে পুরে নিল।

জ্বরের কারণে খাবারের স্বাদ পাচ্ছে না, কিন্তু ছোট বোনের হাতে খাওয়ার আনন্দে চোখ ভিজে উঠল।

রাহা একের পর এক লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে লাগল।

---

এই দৃশ্য দেখে হাজির হলো হিয়া, টুম্পা,রুম্পা, আর টিয়ান।

— আমাদেরও খাওয়াও!
একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল সবাই।

আনন্যা বেগম হেসে রাহার প্লেটে আরও খাবার তুলে দিলেন।

কে আগে খাবে তা নিয়ে শুরু হয়ে গেল হইচই।

শেষমেশ রাহা বাধ্য হয়ে সবাইকে নিজের হাতে খাইয়ে দিল।

দৃশ্যটা দেখে সবার চোখ জুড়িয়ে গেল।

বেল্লাল খান তো তাড়াতাড়ি কয়েকটা ছবি তুলেও ফেললেন।

---

এরপর শুরু হলো ফ্যামিলি ফটো সেশন।

লিপি বেগম আর সালমা বেগম বাড়ির বড়দের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন।

বেল্লাল খান ক্যামেরায় টাইমার সেট করে নিজেও দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালেন।

ইশান আর ধূসরও এসে যোগ দিল।

সবশেষে করম আলী খান আর কোহিনুর বেগমকে সাজিয়ে নিয়ে এল পাঁচ নাতনি।

করম আলী খানের পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি।

কোহিনুর বেগমের গায়ে টুকটুকে লাল বেনারসী শাড়ি ।

একটার পর একটা ছবি উঠতে লাগল।

হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসায় ভরে উঠল পুরো খানবাড়ি।

---

যৌথ পরিবারে বসবাসের মধ্যে সত্যিই অন্যরকম শান্তি আছে।এক ছাদের নিচে এত মানুষকে নিয়ে থাকা সহজ নয়।মতের অমিল থাকবে, ঝগড়া হবে, অভিমান হবে।
তবু ভালোবাসা, সম্মান আর ত্যাগ মিলিয়েই গড়ে ওঠে একটি পরিবার।
আজ কবির খান মনে মনে ভাবলেন, বিদেশ ছেড়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না।
টাকা হয়তো সাময়িক সুখ দেয়।
কিন্তু মানসিক শান্তি?
সেটা শুধু পরিবারই দিতে পারে।

---

রাতের খাবার শেষে সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেল।

কিন্তু আনিকার রুম দখল করে বসেছে হিয়া, রাহা, টুম্পা,রুম্পা,আর পুচকে টিয়ান। আগে তো ইশান এ এসে যোগ দিতো।আজ আসেনি হয়তো টির পায়েনি সে।

নিজের রুমেই নিজের জায়গা নেই আনিকার।
তবুও ভালো লাগছে।

কতদিন পর আবার সবাই মিলে গাদাগাদি করে ঘুমানোর সুযোগ এসেছে!

---

হিয়া রাহাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

— রাহু রে, আজ নুপুর আন্টিকে যেভাবে জব্দ করলি! আমি শুধু ওনার মুখটাই দেখছিলাম! তুই কি করে জানলি ঝুমুর আপু ব্যপারে।

রাহা হেসে বলল,
— ঝুমুর আপুই বলেছে সব। মাঝে মধ্যে কথা হতো।

কিছুক্ষণ পর হিয়া ইতস্তত করে বলল,

— একটা কথা বলব? রাগ করিস না?

— বল।

— চল হোস্টেল থেকে সব নিয়ে বাড়ি চলে আসি। কয়দিন পরই তো পরীক্ষা। বাড়িতে থেকে পড়লে বেশি ভালো হবে।

রাহা ফোনে গেম খেলছিল।

তবুও বুঝে গেল হিয়ার মনের কথা।

— এত ঘুরিয়ে বলতে হবে না। সরাসরি বল, তুই হোস্টেলে যেতে চাস না।

হিয়া চুপ।

রাহা হালকা হেসে বলল,

— আচ্ছা, যাব না।

হিয়া আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

— সত্যি!

— হ্যাঁ। এখন চুপ করে ঘুমা।

---

এসময় টিয়ান উঠে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

— সবাই বাড়িতে থাকবে?

— হ্যাঁ।

টিয়ানের মুখ ভার হয়ে গেল।

আনিকা কাছে টেনে নিল তাকে।

— কী হয়েছে আমাদের ছোট্ট খান সাহেবের?

টিয়ান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

— সবাই বাড়িতে থাকবে, আর আমাকে মাদ্রাসায় দিয়ে আসবে! আমি যাব না। আমিও সবার সঙ্গে থাকব।

রাহা বলল,

— ইস! কত শখ! আমি ছোট চাচ্চুকে বলব তোকে ঘাড় ধরে মাদ্রাসায় দিয়ে আসতে।

— সরি! আর দুষ্টুমি করব না!

— কান ধরে বললেই হবে না। একটা ডিজে গানে নাচতে হবে।

— বনু!

আনিকার ধমক খেয়ে চুপ করে গেল রাহা।

শেষমেশ আনিকা টিয়ানকে কোলে নিয়ে তার রুমে পৌঁছে দিতে বেরিয়ে গেল।

---

ফিরে এসে নিজের রুমে না গিয়ে ছাদে চলে গেল সে।
একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে। ইদানীং তার কিছু ভালো লাগে না। একটা বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তিত।কাউকে কিছু বলতেও পারছে না।

---

ছাদের দোলনায় বসে ছিল তাজ।
দশ মিনিট ধরে সাথীর সঙ্গে কথা বলছিল সে।
সাথী কাল শপিংয়ে যেতে চায়।
কিন্তু কালই তো যশোর যাওয়ার কথা।
এই নিয়ে মনোমালিন্য হয়ে কল কেটে দিয়েছে সাথী।
তাজ বিরক্ত হয়ে বসেছিল।
ঠিক তখনই ছাদে এল আনিকা।
লাইট জ্বালতেই তাকে দেখতে পেল তাজ।

— ভাইয়া, আপনি এখানে?

— ঘুম আসছে না। তুমি?

— দুপুরে অনেক ঘুমিয়েছি। এখন আর ঘুম আসছে না।

— তাই একা একা ছাদে চলে এলে? ভুতের ভয়ে নেই।

— আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।

তাজ হেসে ফেলল।

তারপর একটু ইতস্তত করে বলল,

— তখন মামির কথায় কষ্ট পেয়েছ?

— আপন মানুষ কষ্ট দিলে কষ্ট লাগে। বাইরের মানুষের কথায় আমি কষ্ট পাই না।

তাজ চুপ করে রইল।

তারপর জিজ্ঞেস করল,

— জ্বর কমেছে?

— হ্যাঁ।

— হাতে ব্যথা?

— দুই দিন পর ঠিক হয়ে যাবে।

---

কথা এগোতে লাগল।

তাজ জিজ্ঞেস করল,

— তোমার পছন্দের কাজ কী?

— গাছ লাগানো, বই পড়া আর রান্না করা।

— আর বাকিদের?

— কয়েকদিন থাকুন, নিজেই জেনে যাবেন।

দুজনেই হেসে উঠল।চারদিকে নীরবতা।শীতল বাতাস।
বেলি ফুলের মিষ্টি সুবাস।অদ্ভুত এক প্রশান্তি।

---

অনেকক্ষণ পর আনিকা উঠে দাঁড়াল।

— আমি যাই। ওরা হয়তো খুঁজছে।

— চলো, আমিও যাই।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

হঠাৎ তাজ থেমে গেল।

খেয়াল না করায় সোজা গিয়ে তাজের পিঠে ধাক্কা খেল আনিকা।

তাজ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।

— আরে! ব্যথা পেয়েছ?

— না, আমি ঠিক আছি।

তাজ একটু ইতস্তত করে বলল,

— তোমার ফোন নম্বরটা দেবে?

আনিকা অবাক হয়ে তাকাল।

তাজ তাড়াতাড়ি বলল,

— মানে... তোমার আর বাকিদের নম্বর তো নেই আমার কাছে।

আনিকা নম্বর বলে দিল।

তাজ সেটা সেভ করে নিল। কান্নাবতী নামে।

---

রুমের সামনে এসে তাজ বলল,

— গুড নাইট।

— গুড নাইট, ভাইয়া।

তাজ নিজের রুমে চলে গেল।

আর আনিকা রুমে ঢুকে দেখল—

চাইনিজ ড্রামা চলতে চলতেই সবাই একে অপরের ওপর হাত-পা তুলে ঘুমিয়ে পড়েছে।

হেসে ফেলল সে।

ফোন বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে দিল।

তারপর চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ল রাহার পাশে।

মুহূর্তের মধ্যেই রাহা ঘুমের মাঝেই তাকে জড়িয়ে ধরল।

আনিকার ঠোঁটে শান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।

বাইরে রাত গভীর হচ্ছে।

আর খানবাড়ির প্রতিটি ঘর ভরে উঠছে আপনজনের উষ্ণতায়। ❤️

#চলবে

16/06/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না
#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা

#পর্ব_১৩

⭕ কপি করা কঠোরভাবে নিষেধ 🚫❌

---

রাহা নিজের রুমের সবকিছু ভেঙেচুরে চুপচাপ বেডে বসে আছে। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কাঁচের টুকরো।

কান্না আসছে না তার। বরং নিজের জীবনের প্রতিই একরাশ করুণা হচ্ছে।

আনিকা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসেই পাশের রুম থেকে ভাঙচুরের শব্দ শুনেছিল। কী হয়েছে, তা বুঝতে তার বাকি রইল না। নিশ্চয়ই আবার বাবা আর রাহার মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে। আর রাহা নিজের সমস্ত রাগ ঝাড়ছে রুমের আসবাবপত্রের ওপর।

দ্রুত রাহার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরের বেহাল দশা দেখে বুকটা কেঁপে উঠল তার। সাবধানে কাঁচের টুকরো এড়িয়ে রাহার পাশে গিয়ে বসল।

নরম গলায় বলল,

— সোনা বনু আমার, রাগ করিস না। দেখ, বাবা তো তোর ভালোর জন্যই বলেছে বাড়িতে থাকতে। জেদ করিস না। রাগ কমলে বাবাকে সরি বলে দিস। আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলব।

আনিকার কথাগুলো শুনে রাহার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল।

এই মেয়েটা আবার এসেছে বাবার হয়ে সাফাই গাইতে!

কই, আনিকাকে তো বাবা কখনো কিছু বলে না। গত মাসেই তো সুন্দরবন ট্যুরে যেতে দিয়েছে। আর তার বেলায়? বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে থাকতে হলেও পরিবারের অনুমতি লাগে। নিজের ইচ্ছেমতো কিছুই করতে পারে না সে।ছোট্ট বেলায়ে তো সে হোস্টেলে যেতে চাইতো না কিন্তু যোর করে দিয়ে আসতো।এখন কেনো যেতে দিচ্ছে না।
আনিকা যা চায়, রেজা খান যেন তাই এনে দেন। অথচ তার বেলায় এমনটা কখনো হয় না।হিংসা হলো রাহার।
রেগে গিয়ে বলল,

— বেরিয়ে যা আমার রুম থেকে! কেন এসেছিস? কে বলেছে তোকে তোর বাবার হয়ে আমার কাছে সাফাই গাইতে?

রাহার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে। এমন রূপ দেখে আনিকারও ভয় লাগল।
সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রাহা তাকে ধাক্কা দিল।
হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল আনিকা। একটি ধারালো কাঁচের টুকরো গিয়ে বিঁধল তার ডান হাতে।

কিন্তু রাহা সেটা খেয়ালই করল না।

সে আনিকাকে টেনে-হিঁচড়ে রুমের বাইরে বের করে দরজা বন্ধ করে দিল।

---

আনিকা আবারও রাহার আচরণে মন খারাপ করল না।

সে জানে, তার ছোট বোনটা এমনই। রাগ হলে নিজেকে সামলাতে পারে না। তবুও সে রাহাকে ভীষণ ভালোবাসে।

সবসময় বাবাকে বুঝিয়ে বলে যেন রাহাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। নিশ্চয়ই আজ বাবা এমন কিছু বলেছেন, যার কারণে রাহা এতটা কষ্ট পেয়েছে।

এতসব ভাবনার মাঝে খেয়ালই করল না, তার হাত থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে মেঝে ভিজে যাচ্ছে।

---

তাজ সবে মাত্র বাসায় ফিরেছে।

সকালে বাবা আর চাচাদের সঙ্গে অফিসে গিয়েছিল। তারপর সিয়ামের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল বলে ফিরতে দেরি হয়েছে।

বাসায় ঢুকেই আনিকাকে ওই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল তার।

ভেজা চুল থেকে এখনও পানি ঝরছে। হাত থেকে রক্ত পড়ছে। অথচ মেয়েটা রাহার দরজায় ধাক্কা মেরে খুলতে বলছে।তাজের রাগ হলো। শুধু হাতে পায়ে বড় হয়েছে
নিজের যত্নটুকুও নিতে পারে না বোকা মেয়েটা!

সে এগিয়ে এসে আনিকার হাত ধরে নিজের রুমে নিয়ে গেল। বেডে বসিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স বের করল।
সাবাধানে কাটা জায়গাটা পরিষ্কার করতে গিয়েই আনিকা ব্যথায় কেঁপে উঠল।

— উহ্...

চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার।

নাক টেনে টেনে কাঁদছে।

হাতের ব্যথার চেয়েও বুকের ভেতরটা বেশি কষ্ট দিচ্ছে তাকে। রাহারও নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হচ্ছে।

তাজ ভেবেছিল হাতের ব্যথাতেই হয়তো সে কাঁদছে।

কাঁদতে কাঁদতে নাকের ডগা লাল হয়ে গেছে। বড় বড় চোখ থেকে টুপটাপ করে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।

অদ্ভুত এক মায়া হলো তাজের।

মাথা নিচু করে কাটা জায়গায় ফুঁ দিতে লাগল। তারপর ব্যান্ডেজ করে দিল।

টাওয়েল এনে ভেজা চুলগুলোও মুছিয়ে দিতে লাগল।

---

আনিকা তাকিয়ে আছে তাজের দিকে।

তাজের দৃষ্টিও কখন যেন আটকে গেছে আনিকার কাঁপতে থাকা গোলাপি ঠোঁটে।

মনে মনে বলল,

"আনিকা নিঃসন্দেহে সুন্দরী। না... সুন্দরী নয়। মায়াবতী। উঁহু, সেটাও ঠিক না। কান্নাবতী। হ্যাঁ, এই নামটাই বেশি মানায় তাকে।"

সময় কতটা কেটে গেল, কেউ জানে না।

এসি চলছিল। তবুও দু'জনের কাছেই যেন চারপাশটা অস্বাভাবিক গরম লাগছিল।

---

নিজের আচরণে নিজেই অবাক আনিকা।
এর আগে কোনো ছেলের দিকে এভাবে তাকায়নি সে। কখনোই না।
বুকের ভেতর কেউ যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত।

তাজের অবস্থাও প্রায় একই।এ কেমন অনুভূতি?আগে তো কখনো হয়নি।আনিকার কাছাকাছি এসেই কি এমন হচ্ছে?
কই, সাথী তাকে জড়িয়ে ধরলেও তো কখনো এমন অনুভূতি হয়নি!

অবশেষে নিজেকে সামলে আনিকা কাঁপা গলায় বলল,
— তা... তাজ ভাইয়া, ছাড়ুন আমাকে।
আমি নিজেই চুল মুছে নিতে পারব।

তাজও দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।
কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বলল,

— হাত কাটল কীভাবে?

মাথা নিচু করে আনিকা উত্তর দিল,

— বনুর রুমে গিয়েছিলাম। ও রাগ করে আসবাবপত্র ভেঙেছে। সেখানকার কাঁচ হাতে ফুটে গেছে।

তাজ বিরক্ত হয়ে বলল,

— রাগ করে কেউ এভাবে ভাঙচুর করে?

আনিকা মৃদু হেসে বলল,

— ছোটবেলা থেকেই ও এমন। রাগটা একটু বেশি।

— রাগ কমলে তোমার কাছে এসে সরি বলে নেবে। তুমি আর কেঁদো না। বেশি অসুবিধা হলে রাজকে দিয়ে আবার ব্যান্ডেজ করিয়ে নিও। দুপুরে খাবার খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিও, ব্যথা কমে যাবে।

— আচ্ছা।

— এখন আমি যাই।

কথা শেষ করে দ্রুত নিজের রুমে চলে এল আনিকা।

---

কিন্তু হৃদয়ের ধুকপুকানি তখনও থামেনি।
এ কেমন নতুন অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় হলো আজ?
অস্থির লাগছে খুব।

ভাবল, নামাজ পড়লে হয়তো মনটা শান্ত হবে। কিন্তু হাতে ব্যান্ডেজ থাকায়ে ওজু করাও সম্ভব নয়।
তাই চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল।

---

অন্যদিকে রাহা এখনও একইভাবে বসে আছে।

রাগ, দুঃখ আর কষ্টে নিজেরই পাগল পাগল লাগছে তার।

হঠাৎ মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তের ফোঁটার দিকে চোখ গেল।
তার তো কোথাও কাটেনি।
তাহলে এই রক্ত কার?
মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল আনিকার কথা।
হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠল।
অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়তো সে তার বোনকে আঘাত করে ফেলেছে।
এবার সত্যিই কান্না পেল তার।
সে তো কখনোই আনিকাকে কষ্ট দিতে চায়নি।
বরং নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে বড় বোনটাকে।
শুধু প্রকাশ করতে পারে না।

---

দ্রুত আনিকার রুমে গেল রাহা।
আনিকা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।
রাহা এগিয়ে গিয়ে কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠল।
জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!

কম্বল সরিয়ে হাতের দিকে তাকাতেই ব্যান্ডেজ চোখে পড়ল।
মেঝেতে বসে ঘুমন্ত আনিকার কাছে অনেকক্ষণ ক্ষমা চাইল সে।
নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে।
তার বোনটা কতটা সরল!
কেউ আঘাত দিলেও সবাইকে ভালোবাসে, সবার যত্ন নেয়, সবাইকে সম্মান করে।
পৃথিবীটা যে এতটা স্বার্থপর, সে কথা যেন এখনও জানে না।
ঘুমন্ত আনিকার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বেরিয়ে এল রাহা।

---

কিন্তু আনিকা ঘুমিয়ে ছিল না।
চোখ বন্ধ করে সবই দেখছিল।
রাহা বেরিয়ে যেতেই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটল।
সে জানত, রাগ কমলেই রাহা তার কাছে ফিরে আসবে।
ক্ষমা চাইতে।

---

রাশেদা খালা এসে রাহার রুম পরিষ্কার করে দিয়ে গেছেন।
কতবার খেতে ডাকলেও যায়নি সে।
শেষে লিপি বেগমও এসে ডেকে গেছেন।

কিন্তু তার এক কথা—
সে খাবে না।

---

খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত।
শুধু রাহা আর আনিকা নেই।
পরিবেশ থমথমে।

যে যার মতো নীরবে খেয়ে যাচ্ছে।

আজ দাদা-দাদিও নিচে নামেননি। কোহিনুর বেগমের হাঁটুর ব্যথা আবার বেড়েছে।
বাড়ির সবাই ভাঙচুরের শব্দ শুনেছে।
আর এটাও জানে যে কাজটা রাহারই।
তবে এসব নতুন কিছু নয়।

---

কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে রেখা বেগম বলে উঠলেন।

— তখন ভাঙচুরের শব্দ হলো। কী হয়েছে ছোট?

অনন্যা বেগম কিছু বললেন না।
লজ্জায় মাথা নিচু করে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
নিজের মেয়ের কাণ্ডকারখানা সামনে কীভাবে বলবেন?

সালমা বেগম উত্তর দিলেন,

— তেমন কিছু না বড় ভাবি। হোস্টেলে যাবে কি যাবে না, সেটা নিয়ে রাহা একটু অভিমান করেছে। মেয়েটা খুব জেদি। এখনও নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। সকালেও খায়নি, এখনো খেতে চাইছে না।

রেখা বেগম সবটা বুঝতে পারলেন।

আর কিছু বললেন না।

---

কবির খান হেসে বললেন,

— রাহা মামুনি রাগ করেছে বুঝলাম। কিন্তু আনিকা মামুনি কোথায়? সে-ও তো খেতে এল না।

লিপি বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— আর বলবেন না ভাইজান। আনি বেটার জ্বর এসেছে। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। একটু আগে খাবার খাইয়ে ওষুধ দিয়ে এসেছি।

তাজ অবাক হয়ে গেল।
আনিকার জ্বর এসেছে?
কিন্তু কিছুক্ষণ আগেও তো শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকই ছিল!
হয়তো হাতের ব্যথার কারণেই জ্বর এসেছে।

---

লিপি বেগমের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল তাজ।

— এ কী তাজ বেটা! খাচ্ছ না কেন? আজ তো তেল-মসলা কম দিয়েই রান্না করা হয়েছে। খাবার কি পছন্দ হয়নি?

তাজ মাথা নেড়ে বলল,

— না পাপিয়া, এমন কিছু না। খাবার খুবই ভালো হয়েছে। তোমরা সবাই বসে খাও না?

সালমা বেগম মুচকি হেসে বললেন,

— আগে তোরা খা বাবা। আমরা পরে একসঙ্গে খাব।

এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না।

---

রেজা খানের গলা দিয়ে খাবার নামছে না।

আজ খাবারের স্বাদ তার কাছে বিষের মতো লাগছে।
সবার দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
তারপর নিঃশব্দে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন।
চোখের আড়ালে চলে গেলেও বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আছে তার।নিজের ছোট
মেয়ের কষ্টটা তিনি বোঝেন।

কিন্তু বাবারা সব সময় ভালোবাসাটা প্রকাশ করতে পারে না।ক
কখনো কখনো কঠোরতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর মমতা।

#চলবে

14/06/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না
#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা
#পর্ব_১২

⭕কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ 🚫❌

রাজ বুঝতে পারছিল না কী বলবে।

আর রাহা? সে অভিনয় করে কান্নার ভাব করছে, অথচ মনে মনে মিটিমিটি হাসছে।

ঠিক তখনই আনন্যা বেগম কড়া গলায় বললেন,

— কী কথা বলছিস তোরা দুই ভাইবোন মিলে?

রাহা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।

রাজ কিছু বলার আগেই দ্রুত বলে উঠল,

— তেমন কিছু না, মেজো মা।

— ও। তোমার কিছু লাগবে রাজ?

— না মেজো মা, আমার কিছু লাগবে না।

— আচ্ছা। কিছু দরকার হলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলবে, কেমন?

— ওকে।

এরপর আনন্যা বেগম রাহার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— রাহা, খেতে আয়। সকালেও কিছু খাসনি। আনিকা বলছিল তোর নাকি জ্বর এসেছিল। এখন কমেছে?

মায়ের কণ্ঠে উদ্বেগ শুনে রাহার বুকটা নরম হয়ে এল। হালকা হেসে বলল,

— কমেছে। টেনশন করতে হবে না। আর আমি খাব না। ছোট বাবাই কিংবা ইশান ভাইয়া বাড়িতে থাকলে ডেকে দিন, আমি চলে যাব।

— বললাম না, তোর বাবা যেতে বারণ করেছে।

— আমিও তো বললাম, আমি এই বাড়িতে থাকব না।

— স্টপ ইট, রাহা। একদম বাড়াবাড়ি করবি না।

ঠিক তখনই রেজা খান বাড়িতে ঢুকলেন।

বাড়ির বাকিরা অনেক আগেই ফিরেছিল, শুধু তাঁরই আসতে দেরি হয়েছে।

ঘরে ঢুকেই তিনি ডিভানের ওপর বসলেন।

স্বামীকে ক্লান্ত দেখেই আনন্যা বেগম রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন ঠান্ডা শরবত আনতে।

রাহাও উঠে উপরে চলে যেতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই রেজা খানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,

— মা-মেয়ের মধ্যে কী নিয়ে কথা হচ্ছিল?

রাহা থেমে দাঁড়াল।

— আমি হোস্টেলে ফিরে যাব।

রেজা খান শান্ত গলায় বললেন,

— আর যেতে হবে না। এখন থেকে বাড়িতেই থাকবে তুমি। শুধু তুমি না, বাড়ির সবাই থাকবে। তুমিও সেই সবার মধ্যেই পড়ো।

একটু থেমে দৃঢ় স্বরে বললেন,

— It's final.

রাহা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,

— No, it's not final.

তারপর একেকটা শব্দ জোর দিয়ে উচ্চারণ করল,

— আমি এই বাড়িতে থাকব না।

রেজা খান এবারও শান্ত স্বরেই বললেন,

— জেদ করো না। বিকেলে ইশানের সঙ্গে হোস্টেলে গিয়ে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে আসবে। ভালো মেয়ের মতো কথা শুনো। আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।

রাহার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল।

— কে বলেছে আপনাকে আমার কথা শুনতে? আমি এই বাড়িতে থাকতে চাই না। এটাও আমার ফাইনাল ডিসিশন।

রেজা খান কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

— আচ্ছা, এই বাড়িতে থাকতে চাও না। তাহলে কোথায় থাকতে চাও?

— হোস্টেলে।

রেজা খান শুষ্কভাবে হেসে বললেন,

— হোস্টেলে থাকতে টাকা লাগে। টাকা ছাড়া তো কেউ থাকতে দেবে না।

কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে একটুও বাকি রইল না রাহার।

মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

বাবা হয়ে আজ তাকেই টাকার খোঁটা দিচ্ছেন!

কিন্তু রাহা অনেক আগেই নিজেকে তৈরি করে রেখেছে।

বহু বছর ধরে সে ফ্রিল্যান্সিং করে নিজের খরচ নিজেই চালায়।

বাড়ি থেকে এক টাকাও নেয় না।

তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

— টাকা ছাড়া হোস্টেলে থাকা যায় না, সেটা আমিও জানি। আপনাকে মনে করিয়ে দিতে হবে না।

রেজা খান বললেন,

— আচ্ছা। তাহলে আজ থেকেই তোমার মাকে বলে দেব তোমাকে যেন কোনো টাকা না দেয়। আমিও দেখতে চাই তোমার এই জেদ কতদিন টেকে।

রাহা এবার হেসেই ফেলল।

— আপনি আমাকে আপনার টাকার দেমাগ দেখাচ্ছেন?

— তুমি যা ভাবতে চাও, ভাবতে পারো।

রাহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

— কিছুই ভাবার নেই। For your kind information, আমার পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া, হাতখরচ—কোনোটার জন্যই আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিই না। আজ থেকে না, কয়েক বছর ধরেই না। তাই আপনার টাকার দেমাগ আমাকে দেখাতে আসবেন না।

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

রেজা খান বিস্মিত হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

টাকা নেয় না মানে?

তিনি তো প্রতি মাসে স্ত্রীকে দুই মেয়ের খরচের জন্য টাকা দেন।

তাহলে?

মেয়েটা কি সত্যিই এতদিন নিজের খরচ নিজেই চালিয়েছে?

রাহার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের যৌবনের কথা মনে পড়ে গেল তাঁর।

একই রকম জেদ।

একই রকম রাগ।

একই রকম একগুঁয়েমি।

রাহার মধ্যে যেন নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পান তিনি।

আর সেই কারণেই তো মেয়েটাকে দূরে রেখেছিলেন।

চেয়েছিলেন, নিজের মতো কোনো ভুল যেন সে না করে।

কিন্তু মেয়ের ভালো করতে গিয়ে অজান্তেই মেয়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছেন।

যে মেয়েটাকে তিনি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসেন।

বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তাঁর।

তবুও কঠোর গলায় বললেন,

— ভুলে যেও না, তোমার এখনো আঠারো বছর হয়নি। নিজের সব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার বয়স তোমার হয়নি।

রাহা ঠান্ডা গলায় বলল,

— আগামী মাসেই আমার আঠারো হবে। তাই কয়েকটা দিনের জন্য আপনাকে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।

— স্টপ ইট! বেয়াদবি করো না। রুমে যাও।

রাহা তিক্ত হেসে বলল,

— মিস্টার খান, বেয়াদবের কাছ থেকে আদব আশা করা বোকামি। আমি আজই হোস্টেলে যাব।

— কখনোই না।

এরপর আর কোনো কথা বলল না রাহা।

আজ বাবার মুখের ওপর অনেক কথা বলে ফেলেছে সে।

বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।

চোখে জল টলমল করছে।

কিন্তু সে কাউকে নিজের দুর্বলতা দেখাবে না।

তাই দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের রুমে চলে গেল।

রেজা খান আগের মতোই বসে রইলেন।

গভীর চিন্তায় ডুবে।

রাজ এতক্ষণ চুপচাপ সবকিছু দেখছিল।

বাবা-মেয়ের এই সম্পর্কের জটিলতা সে অনেকটাই বুঝে গেছে।

ঠিক তখনই উপরতলা থেকে কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ ভেসে এল।

রাহা নিজের রাগ ঘরের জিনিসপত্রের ওপর ঝাড়ছে—এটা বুঝতে কারও বাকি রইল না।

আনন্যা বেগম শরবতের ট্রে নিয়ে এসে স্বামীর সামনে রাখলেন।

রেজা খান এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাস শেষ করলেন।

তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,

— রাহা কোনো টাকা নেয় না মানে? কী বলল ও? আমি তো প্রতি মাসে টাকা দিই ওদের জন্য।

আজ আর চুপ করে থাকলেন না আনন্যা বেগম।

বহুদিনের জমে থাকা কথাগুলো বেরিয়ে এল।

— হ্যাঁ। কয়েক বছর ধরেই রাহা আমার কাছ থেকে কোনো টাকা নেয় না। মেয়েটা পুরো আপনার মতো হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং করে নিজের খরচ নিজেই চালায়। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

— মেয়ের ভালো চেয়ে ছোটবেলা থেকে ওকে দূরে রেখেছি। কিন্তু এতে ও আরও বেশি জেদি হয়ে গেছে। ভালো করতে গিয়ে উল্টো মেয়েটার মনটাই ভেঙে দিয়েছি।

কথা শেষ করে আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন তিনি।

রেজা খান কোনো সান্ত্বনার কথা খুঁজে পেলেন না।

নীরবে উঠে নিজের রুমে চলে গেলেন।

আর আনন্যা বেগম ধীর পায়ে হাঁটলেন তাঁর পেছন পেছন।

#চলবে

Want your business to be the top-listed Beauty Salon in Chittagong?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address

Chittagong
BORGUNA