SOBUJ USA
আসসালামু আলাইকুম
প্লিজ সবাই পেজটিকে ফলো করে রাখুন
my YouTube channel subscribe
https://youtube.com/@SobujMiah-je2jm?si=LA68lZCoo2jRYRej
09/29/2026
কমিউনিটির সত্য ঘটনাগুলো খুঁজে খুঁজে গল্প লেখা শুরু করলাম। প্রশ্ন করতে পারেন এতে কমিউনিটির কি হেল্প হবে! সচেতনতা। নিজের কমিউনিটির অজানা কাহিনীগুলো জেনে সাবধান হওয়া। আপনার জানা কোনো ঘটনা থাকলে আমাকে ইনবক্স করতে পারেন। হাতে সময় থাকলে এই গল্পটা পড়ে দেখার অনুরোধ।
এক॥
মানুষের জীবনে কিছু আবিষ্কার থাকে, যেগুলো মহাকাশ বিজ্ঞানের মতো জটিল না। কিন্তু গুরুত্বও কম না। আমেরিকায় আসার পর প্রথম দিকেই মিতার এমন তিনটা আবিষ্কার হয়েছিল।
প্রথম আবিষ্কার, এই দেশে শীতকালে গাছের পাতা সব ঝরে যায়। প্রথমবার দেখে মিতার মনে হয়েছিল, গাছগুলো বুঝি মরে গেছে। ডালপালা খালি, কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। কিন্তু কয়েক মাস পর বসন্ত এলে সেই শুকনো মনে হওয়া ডালেই আবার কুঁড়ি বের হলো, পাতা গজাল। তখন মিতা বুঝল, সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে মনে হলেই সত্যি সত্যি শেষ হয়ে যায় না। কিছু জীবন বাইরে থেকে চুপচাপ থাকে, ভেতরে ভেতরে শুধু সময়ের অপেক্ষা করে।
দ্বিতীয় আবিষ্কার, দোকানে ঢুকলে ক্যাশিয়ার হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, “হাউ আর ইউ?” প্রথমবার প্রশ্নটা শুনে মিতা ভেবেছিল, মহিলা সত্যিই তার শরীরের খবর জানতে চাইছেন। সে বলতে শুরু করেছিল, রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি, মাথাটাও একটু ধরেছে। মহিলা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে রসিদ এগিয়ে দিলেন। “হ্যাভ আ নাইস ডে।” সেদিন মিতা বুঝেছিল, আমেরিকায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না। কিছু প্রশ্ন আসলে প্রশ্নই না।
তৃতীয় আবিষ্কারটা তার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল। কল খুললেই গরম পানি আসে। বাংলাদেশে শীতের সকালে গোসল করতে হলে বড় হাঁড়িতে পানি গরম করতে হতো। কখনো গ্যাস থাকত, কখনো থাকত না। এখানে কল ঘোরালেই ধোঁয়া ওঠা গরম পানি।
প্রথম দিন মিতা বাথরুমে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেই পানি দেখেছিল। দরজার ওপাশ থেকে একটা মেয়ের গলা এলো, “আপা, পানি কি আপনার আত্মীয়?”
মিতা চমকে উঠল। “কেন?”
“দশ মিনিট ধরে খালি তাকায় আছেন। কথা-টথা বলবেন, না গোসলও করবেন?”
এই ছিল মিতা আর শিউলির প্রথম কথা। জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক খুব সাধারণ মুহূর্তে শুরু হয়। শুরু হওয়ার সময় কেউ বুঝতেও পারে না, এই মানুষটা একদিন তার জীবনের কতটা জায়গা নিয়ে নেবে।
দুই
কুইন্সের একটা পুরোনো বাড়ির দোতলায় ছোট্ট একটা ঘর। দুইটা সিঙ্গেল বেড। মাঝখানে তিন ড্রয়ারের প্লাস্টিকের ক্যাবিনেট। একটা ড্রয়ার ঠিকমতো বন্ধ হতো না। জানালার পাশে ছোট টেবিল। তার ওপর দুইটা মগ, ভাঙা হ্যান্ডেলের একটা কেটলি আর ছোট্ট একটা মানিপ্ল্যান্ট।
গাছটা শিউলির। অবশ্য গাছটা বড় হচ্ছিল না। মাসের পর মাস একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হতো, আমেরিকায় এসে সেও বুঝে গেছে, বড় হওয়া সহজ কাজ না।
শিউলি প্রতিদিন পানি দিত। একদিন মিতা বলল, “এত পানি দিস কেন?”
“গাছ বড় হবে।”
“আর একটু বেশি দিলে মাছ ছাড়তে পারবি।”
শিউলি গম্ভীর মুখে বলল, “তুমি গাছ সম্পর্কে কিছু জানো না।”
“তুই জানিস?”
“না। কিন্তু আত্মবিশ্বাস আছে।”
দুজনে হেসে ফেলল। মিতার তখন টাকা কম। শিউলিরও। মানুষের পকেটে টাকা কম থাকলে বিনা পয়সার জিনিসের ব্যবহার বেড়ে যায়। হাসি তার মধ্যে একটা।
মিতা ডিভি লটারিতে আমেরিকায় এসেছে। দেশে সবাই বলেছিল, “তোর ভাগ্য খুলে গেছে।” ভাগ্য হয়তো খুলেছিল। কিন্তু সেই দরজার ওপাশে বসে ছিল অনেক পরিশ্রম।
সপ্তাহে পাঁচ দিন সে ডেলিতে কাজ করত। স্যান্ডউইচ বানানো, কফি ঢালা, ক্যাশে বসা। আরও কয়েক দিন সন্ধ্যায় পরিচিত এক আপার দোকানে হিসাব লিখত। শনিবারে বেবিসিটিং। চার বছরের একটা বাচ্চা তাকে প্রতিবার দেখেই জিজ্ঞেস করত, “তুমি কি রোবট?” মিতা বলত, “না। কিন্তু তুমি খাবার খেলে তোমার জন্য রোবট হতে পারি।”
দিন শেষে বাসায় ফিরলে পা দুটো আর নিজের বলে মনে হতো না। শিউলি তখন কখনো ডাল গরম করত, কখনো ভাত।
“আজ কী রান্না?”
“ডাল।”
“কাল?”
“ডাল।”
“পরশু?”
“পরিকল্পনা আছে।”
“কী?”
“ডাল।”
এই একই কথায় তারা বহুবার হেসেছে। মাঝে মাঝে শুক্রবারে ছোট একটা ইলিশের টুকরা কিনত। দুজনে ভাগ করে খেত। শিউলি মাছের মাথা চাইত। মিতা বলত, “মাথা খেলে বুদ্ধি বাড়ে।” শিউলি বলত, “তাই তোমারে দিচ্ছি না। তোমার বুদ্ধি আর বাড়ানোর দরকার নাই।”
একজনের দেশে ফোন এলে অন্যজন চুপ হয়ে যেত। কেউ মায়ের কথা বলতে বলতে গলা ভারী করলে অন্যজন উঠে চা বানাত। তাদের বন্ধুত্বের অনেক কথাই মুখে বলা হতো না।
কোনো মাসে একজনের বেতন কম হলে আরেকজন বলত, “এই মাসে আমি ভাড়া একটু বেশি দিই। পরের মাসে তুই দিবি।” পরের মাসে কে কত দিল, সেটা আর কারও মনে থাকত না।
এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো বাড়ি অন্ধকার। জানালার বাইরে অন্য বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে।
শিউলি ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বলল, “আমেরিকা নাকি?”
মিতা বলল, “আমেরিকারও কারেন্ট যায়।”
“এতদিন বাংলাদেশরে ছোট করছিলাম।”
“দেশে গিয়ে বলিস না। সবাই ভাববে আমরা কষ্টে আছি।”
“আমরা কি কষ্টে নাই?”
মিতা একটু ভেবে বলল, “আছি। কিন্তু ফেসবুকে বলব না।”
অন্ধকার ঘরে দুজন আবার হেসে উঠল।
দুই বছর কেটে গেল এভাবেই। কখন যে শিউলি রুমমেট থেকে বোন হয়ে গেছে, মিতা নিজেও বুঝতে পারেনি। কিছু সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিন থাকে না। একদিন হঠাৎ বোঝা যায়, মানুষটা নিজের জীবনের ভেতরে ঢুকে গেছে।
তিন
এক সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে শিউলি বলল, “আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
মিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। “কবে?”
“আগামী মাসে দেশে যাব।”
“এত তাড়াতাড়ি?”
“বাড়ির সবাই বলছে ছেলে ভালো।”
“তুই কী বলিস?”
শিউলি ফোন বের করে ছবি দেখাল। লম্বা, শান্ত চেহারার একটা ছেলে। নাম রাশেদ।
মিতা বলল, “কথা হয়?”
শিউলি একটু লজ্জা পেল। “হয়।”
“কতক্ষণ?”
“এই তো।”
“এই তো কত?”
“রাতে দুই ঘণ্টা।”
মিতা চোখ বড় করল। “আমি তো ভাবতাম তুই বাথরুমে এতক্ষণ কী করিস!”
শিউলি বালিশ ছুড়ে মারল।
পরের কয়েক সপ্তাহ ঘরের চেহারা বদলে গেল। শাড়ি, কসমেটিকস, উপহার, শাল, শার্ট, লাগেজ। এক রাতে দুজন লাগেজের ওপর বসে চেইন টানছিল।
মিতা বলল, “আর কিছু আছে?”
“একটা প্রেসার কুকার।”
“তোর বরকে ব্যাগে ঢুকা। কুকার পরে পাঠায়ে দিস।”
যাওয়ার দিন এয়ারপোর্টে শিউলি বলল, “কাঁদিস না।”
মিতা বলল, “আমি কেন কাঁদব?”
“তোর চোখ লাল।”
“ঘুমাই নাই।”
“মিথ্যাবাদী।”
দুজন জড়িয়ে ধরল। মানুষ জানে না কোন আলিঙ্গনটা শেষ আলিঙ্গন। জানলে হয়তো একটু বেশি সময় ধরে রাখত।
শিউলি দেশে গেল। বিয়ে করল। ভিডিও কলে মিতাকে সব দেখাল। রাশেদ পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনার কথা অনেক শুনেছি।”
মিতা বলল, “ভালো কথা তো?”
পেছন থেকে শিউলি বলল, “সব বলি নাই।”
দুই মাস পর শিউলি নিউইয়র্কে ফিরল। এয়ারপোর্টে তাকে দেখে মিতা বলল, “তোর চেহারা এত উজ্জ্বল কেন?”
“বাংলাদেশের বাতাস।”
“না। এইটা অন্য কিছু।”
কয়েক সপ্তাহ পর জানা গেল, সত্যিই অন্য কিছু। শিউলি মা হতে যাচ্ছে।
খবরটা শুনে সে প্রথমে হাসল। তারপর কাঁদল। তারপর আবার হাসল। মিতা বলল, “একসঙ্গে সব করবি?”
“আমি নিজেই বুঝতেছি না কী করব।”
মিতা পেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “শোনো, তোমার মা একটু পাগল টাইপের। আগে থেকেই জানায়ে রাখলাম।”
বালিশ আবার উড়ে এলো।
চার
গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক মাস কঠিন গেল। বমি, অরুচি, গন্ধে সমস্যা। শিউলি আগে ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ ভালোবাসত। এখন গন্ধ পেলেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যেত।
মিতা বলল, “তাহলে রান্না করবে কে?”
বিছানা থেকে উত্তর এলো, “বাচ্চার খালা।”
“আমি খালা হলাম কবে?”
“আজকে।”
“বেতন?”
“বাচ্চা বড় হলে দিবে।”
“চুক্তিটা সুবিধার মনে হচ্ছে না।”
তবু রান্না করত মিতা। কোমরে ব্যথা হলে গরম তোয়ালে দিত। সময় মিললে ডাক্তারের কাছে সঙ্গে যেত।
এক রাতে সাড়ে এগারোটায় শিউলি বলল, “কাঁচা আম খেতে ইচ্ছা করতেছে।”
মিতা কম্বলের ভেতর থেকে বলল, “এখন?”
“হ্যাঁ।”
“কাল?”
“না।”
“বাচ্চাকে বোঝা।”
“বাচ্চা বলছে এখনই।”
পরদিন কাজ শেষে তিন দোকান ঘুরে কাঁচা আম নিয়ে ফিরল মিতা। শিউলির চোখ চকচক করে উঠল।
“তুই পেয়েছিস?”
“হ্যাঁ। দামটা বাচ্চা জন্মের পরে ওর কাছ থেকে নেব।”
আম খেতে খেতে শিউলি বলল, “তুই না থাকলে আমি কী করতাম?”
“তোর বরকে ফোন করতি।”
“ও বাংলাদেশে বসে কী করত?”
“কাঁচা আমের ছবি পাঠাত।”
সেই রাতে অনেক কথা হলো। বাচ্চার নাম। রাশেদ কবে আসবে। ছেলে হলে কী নাম। মেয়ে হলে কী নাম।
হঠাৎ শিউলি বলল, “তুই থাকবি তো?”
মিতা তাকাল। “আমি কোথায় যাব?”
“এমনিই বললাম।”
এই “এমনিই” কথাটা পরে বহুবার মনে পড়েছে মিতার।
মাস যেতে লাগল। ছোট ঘরে নতুন মানুষের জিনিস জমতে লাগল। বেবি বেসিনেট, ছোট কম্বল, বোতল, ডায়াপার।
একদিন মিতা হাতে একটা ছোট মোজা নিয়ে বলল, “মানুষের পা এত ছোট হয়?”
শিউলি বলল, “জন্মের পরে বড় হয়।”
“এইটা আমি জানি। ভাবতেছি, হারাইলে খুঁজে পাব কীভাবে?”
শিউলি হেসে বলল, “তুই সবকিছু নিয়ে আগে চিন্তা করিস।”
“কেউ একজন তো করবেই।”
শিশুর জন্মের সময় যত কাছে এল, শিউলির হাঁটাচলা তত কঠিন হলো। একদিন সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি আর পারতেছি না।”
মিতা নিচ থেকে বলল, “আর দুই ধাপ।”
“দুই ধাপ অনেক।”
“বাচ্চাকে বল, একটু হালকা হোক।”
সেদিন সন্ধ্যায় মিতা তার পা টিপে দিচ্ছিল। শিউলি বলল, “রাশেদ যদি এখন থাকত ভালো হতো।”
“হতো।”
“আমি যদি কিছু করি?”
মিতার হাত থেমে গেল। “কী করবে?”
“ডেলিভারিতে কিছু হয়ে যায় যদি।”
“এইসব কথা বলিস না।”
“এমনিই বললাম।”
“এমনিইও বলবি না।”
শিউলি হেসেছিল। “তুই রাগ করিস কেন?”
মিতা বলেছিল, “কারণ আমি ভয় পাই।”
পাঁচ
ডেলিভারির দিন ভোরে ব্যথা শুরু হলো।
শিউলি বলল, “এটা কি আসল ব্যথা?”
মিতা বলল, “আমি কীভাবে জানব?”
“গুগল কর।”
“গুগল কি তোর পেট দেখছে?”
ব্যথার মধ্যেও শিউলি হাসল।
হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাগে কাগজপত্র, কাপড়, চার্জার, বাচ্চার ছোট পোশাক। মিতা তিনবার ব্যাগ পরীক্ষা করল।
শিউলি বলল, “বাচ্চা কি তোর?”
মিতা বলল, “এই কয় মাস যা খাওয়াইছি, অর্ধেক তো আমারই।”
হাসপাতালে ঢোকার সময় বাইরে সকাল হচ্ছিল। ভেতরে ঢুকে শিউলির হাসি চলে গেল। সে মিতার হাত শক্ত করে ধরল।
“তুই আছিস তো?”
“আছি।”
খুব ছোট একটা শব্দ। কিন্তু মানুষের জীবনে কখনো কখনো ছোট শব্দও বড় প্রতিশ্রুতি হয়ে যায়।
ঘণ্টা কেটে গেল। শিশুটি জন্ম নিল। সুস্থ। জোরে কাঁদছে।
খবর শুনে মিতা হেসেছিল। তারপর চোখে পানি চলে এসেছিল। সে বাংলাদেশে ফোন করার কথা ভাবছিল।
ঠিক তখনই চারপাশ বদলে গেল। চিকিৎসকেরা দ্রুত চলাফেরা করছিলেন। নার্সদের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। মিতাকে বাইরে যেতে বলা হলো।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
মিতা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর একজন চিকিৎসক এলেন। অনেক কথা বললেন। জটিলতা। রক্তক্ষরণ। চেষ্টা।
শেষ কথাটা খুব ছোট ছিল।
শিউলি আর নেই।
মিতা কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারেনি।
শিউলি একটু আগেও ছিল। ব্যাগে তার কাপড় আছে। ফোনে তার ছবি আছে। ফ্রিজে তার জন্য রাখা দই আছে।
একজন মানুষ এত দ্রুত “আছে” থেকে “ছিল” হয়ে যায় কীভাবে?
মিতা করিডোরের একটা চেয়ারে বসে পড়ল। কান্না প্রথমে এল না। অদ্ভুতভাবে তার কাঁচা আমের কথা মনে পড়ছিল। শোকের প্রথম মুহূর্তে মানুষের মাথা সব সময় যুক্তি মেনে চলে না।
দূরে কোথাও শিশুটি কাঁদছিল। নিজের মাকে কোনোদিন চিনতে না পেরেই।
ছয়
তারপর শুরু হলো অন্য জীবন। বাংলাদেশে খবর দেওয়া। রাশেদের সঙ্গে কথা। শিউলির পরিবারের কান্না। কাগজপত্র। মানুষ। পরামর্শ। এর মধ্যে ছোট্ট শিশুটি।
প্রথমবার মিতা তাকে কোলে নিয়েছিল খুব ভয়ে।
নার্স বলল, “মাথাটা সাপোর্ট করুন।”
মিতা বলল, “আমি পারব তো?”
“পারবেন।”
তখন সে বিশ্বাস করেনি। পরে বুঝেছে, মানুষ প্রয়োজনের সময় এমন অনেক কিছু পারে, যা আগে নিজের সম্পর্কে জানতই না।
রাশেদ বাংলাদেশে। ভিসা নেই। প্রথম দিকে আত্মীয়স্বজন সাহায্য করলেও রাত নামলে শিশুটি বেশির ভাগ সময় মিতার কাছেই থাকত।
প্রথম রাতেই মিতা বুঝল, নবজাতকের সঙ্গে যুক্তি চলে না। বোতল একবার বেশি গরম, আরেকবার ঠান্ডা। শিশু কাঁদছে।
মিতা বলল, “তুমি একটু সহযোগিতা করতে পারো না?”
কান্না আরও বাড়ল।
“ঠিক আছে। তোমার মতামত বুঝেছি।”
রাত তিনটায় তাকে কোলে নিয়ে ঘরের মধ্যে হাঁটছিল মিতা। একই দুইটা বিছানা। একটা খালি। শিউলির বালিশ, কম্বল, চটি সব আছে। শুধু শিউলি নেই।
শিশুটি মাঝে মাঝে মিতার বুকের কাছে ঘুমিয়ে যেত। মিতা তার শ্বাস দেখত। ছোট বুকটা ওঠানামা করছে।
মা হওয়ার শুরু কোথায়, সে জানত না। হয়তো কোনো কোনো সম্পর্কের শুরু কোনো নাম দিয়ে হয় না। শুধু একজন মানুষ আরেকজনকে ছেড়ে যেতে পারে না।
রাশেদের জরুরি ভিসার চেষ্টা চলছিল। প্রায় প্রতিদিন ফোন হতো।
একদিন রাশেদ জিজ্ঞেস করল, “বাচ্চা কেমন?”
“ভালো।”
“ঘুমায়?”
“দিনে।”
“রাতে?”
“আমাদের শত্রু।”
ফোনের ওপাশে রাশেদের গলা কেঁপে উঠল।
মিতা বলল, “তুমি আসো। তারপর তোমার শত্রু তোমাকে বুঝিয়ে দেব।”
কয়েক সপ্তাহ পর ভিসা হলো। এয়ারপোর্টে রাশেদকে দেখে মিতা চিনতে একটু সময় নিল। কয়েক মাসেই মানুষটা যেন অনেকটা বুড়িয়ে গেছে।
সে শিশুটির কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কোলে নিল।
শিশুটি কাঁদল।
রাশেদও।
মিতা জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিল। কিছু কান্না মানুষকে একটু আড়াল দিয়েই কাঁদতে দিতে হয়।
সাত
পরের কয়েক মাসে তারা তিনজন অদ্ভুত একটা পরিবারের মতো হয়ে গেল।
রাশেদ বাবা।
মিতা কী? খালা? অভিভাবক? বন্ধু?
কোনোটাই যেন পুরো উত্তর না। সে শুধু মিতা।
শিশুর জ্বর হলে দুজনই জাগত। ডাক্তারের কাছে যেত। ডায়াপার, ফর্মুলা কিনত। রাশেদও ধীরে ধীরে আমেরিকার জীবন শিখছিল।
এই সময় পরিচিতদের মধ্যে একটা কথা উঠল।
“মিতা আর রাশেদের বিয়ে হলে কেমন হয়?”
প্রথমবার শুনেই মিতা সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। শিউলি তার বন্ধু। এই ঘরে তারা কত রাত কথা বলেছে, হেসেছে, কেঁদেছে। বন্ধুর স্বামীকে বিয়ে করার কথা তার কাছে অস্বস্তিকর লাগত।
মানুষজন যুক্তি দিল। বাচ্চার জন্য ভালো। রাশেদের জন্য ভালো। মিতাও একা।
মিতা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “সবাই এত সহজ করে বলেন কেন?”
একজন আপা বলেছিলেন, “সহজ না। বাস্তব।”
বাস্তবতা খুব সুবিধাজনক একটা শব্দ। অন্যের জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তও এটা দিয়ে ছোট করে বলা যায়।
মিতা রাজি হলো না। তারপর দিন গেল। এক রাতে শিশুর জ্বর। সারারাত মিতা কোলে নিয়ে বসে ছিল। রাশেদ পাশে।
ভোরে শিশুটি ঘুমিয়ে পড়লে রাশেদ বলল, “আপনি অনেক করছেন।”
মিতা বলল, “আপনি বলছেন কেন?”
মিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি তো ওরে ছেড়ে যেতে পারি না।”
কথাটা বলেই সে থেমে গেল।
শিশুটাকে? নাকি এই জীবনটাকে?
কয়েক মাস পরে তারা বিয়ে করল। ছোট অনুষ্ঠান। কিছু পরিচিত মানুষ।
কেউ বলল, “আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন।”
মিতা হাসেনি।
রাশেদও না।
তাদের নতুন সংসার শুরু হলো পুরোনো একটা স্মৃতির ভেতর। শিউলির নীল শাল ছিল। একটা মগ। কয়েকটা ছবি। মিতা কিছুই ফেলে দেয়নি।
একদিন শিশুটি হামাগুড়ি দিয়ে শিউলির ছবির কাছে গেল।
মিতা ছবি তুলে বলল, “এইটা তোমার মা।”
শিশু ছবির ওপর হাত দিল।
মিতা হেসে বলল, “এই মহিলা আমাকে অনেক বিরক্ত করত।”
কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা একটু কেঁপেছিল।
আট
বছর যেতে লাগল। শিশুটি মিতাকে কী বলে ডাকবে, এটা নিয়েও কথা উঠেছিল। কেউ বলেছিল মা। কেউ বলেছিল খালা।
মিতা কিছু ঠিক করে দেয়নি।
একদিন শিশুটি নিজেই তাকে “মা” বলে ডাকল।
মিতা তখন রান্নাঘরে। হাতে ভেজা প্লেট। শব্দটা শুনে তার হাত থেমে গেল। রাশেদ পাশের ঘর থেকে তাকাল। কেউ কিছু বলল না।
কিছু মুহূর্ত এত ছোট হয় যে বাইরে থেকে দেখলে কিছুই মনে হয় না। অথচ একটা মানুষের পুরো জীবন সেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে।
মিতা আর নিজের সন্তান নেয়নি। মানুষ জিজ্ঞেস করত, “আর বাচ্চা হবে না?”
সে হাসত। “এই একটারে সামলাই আগে।”
শিশুটিকে স্কুলে ভর্তি করল। প্রথম দিনের ছবি তুলল। লাঞ্চবক্স বানাল। জ্বর হলে কাজ থেকে ছুটি নিল। স্কুল থেকে ফোন এলে দৌড়ে গেল।
একদিন খেলতে গিয়ে হাঁটু কেটে শিশুটি কাঁদছিল।
মিতা ওষুধ দিতে দিতে বলল, “এত কান্না কেন?”
“ব্যথা।”
“আমি ছোট থাকতে এর চেয়ে বেশি লাগছে।”
বাচ্চা অবাক হয়ে বলল, “তুমি ছোট ছিলে?”
মিতা একটু ভেবে বলল, “না। আমি সরাসরি বড় হয়ে জন্মেছি।”
কান্নার মধ্যেও শিশুটি হেসে ফেলল।
এদিকে শিউলির মৃত্যুর চিকিৎসা নিয়ে যে মামলা হয়েছিল, সেটা বছরের পর বছর চলল। শেষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এলো।
রাশেদ বলল, “এই টাকা নষ্ট করা যাবে না।”
“কী করবা?”
“ব্যবসা।”
একটা ছোট গ্রোসারি দোকান কেনার সুযোগ এল। শেলফ পুরোনো। ফ্রিজের দরজায় দাগ। পেছনে ছোট্ট স্টোররুম।
প্রথম দিন দোকান দেখে মিতা বলল, “এইটা দোকান?”
রাশেদ বলল, “কী সমস্যা?”
“দোকানের আগে চিকিৎসা দরকার।”
রাশেদ হেসে বলল, “দেখো, একদিন ঠিক দাঁড়াবে।”
মিতার নিজেরও বহু বছরের সঞ্চয় ছিল। সে টাকাটা ব্যবসায় দিল।
রাশেদ বলেছিল, “সব দিও না।”
মিতা বলেছিল, “সব না।”
আসলে প্রায় সবই দিয়েছিল।
তার কাছে তখন হিসাবটা খুব সহজ ছিল। এটা তাদের সংসার। তাদের ভবিষ্যৎ। তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ।
নয়
দোকানের প্রথম বছরটা কঠিন গেল। সকাল থেকে রাত। পণ্য তোলা, দাম লেখা, সাপ্লায়ার, ক্যাশ কাউন্টার, হিসাব। তারপর বাসায় ফিরে রান্না, শিশুর পড়া।
এক রাতে হিসাবের খাতার ওপর মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিল মিতা। বাচ্চা তার মাথায় ছোট কম্বলটা দিয়ে দিয়েছিল।
রাশেদ ছবি তুলে পরদিন দেখাল। “ব্যবসায়ী মহিলা।”
মিতা বলল, “এই ছবি কাউরে দেখাইলে তালাক দিয়ে দিব।”
তখন “তালাক” কথাটা ছিল একটা মজা। মানুষ জানে না কোন শব্দটা একদিন সত্যি হয়ে ফিরে আসবে।
ব্যবসা ধীরে ধীরে ভালো হলো। নতুন ফ্রিজ এলো। সাইনবোর্ড বদলাল। কাস্টমার বাড়ল।
রাশেদও বদলাতে শুরু করল। নতুন গাড়ি। নতুন ফোন। নতুন বন্ধু। এসব নিয়ে মিতার কোনো আপত্তি ছিল না।
কিন্তু তার কথা বলার ধরন বদলে যাচ্ছিল।
মিতা হিসাব নিয়ে কিছু বললে রাশেদ বলত, “তুমি বুঝবা না।”
একদিন সাপ্লায়ারের সামনে বলল, “ও এসব বুঝে না।”
মিতা কিছু বলল না সেখানে। বাসায় এসে জিজ্ঞেস করল, “ওইভাবে বলতে হলো?”
রাশেদ বলল, “কী বলছি?”
“আমি কিছু বুঝি না।”
“আরে, কথার কথা।”
কথার কথা বলে অনেক কিছুই ছোট করা যায়। অপমানও।
রাশেদ দেরিতে বাসায় ফিরতে শুরু করল। ফোনে সময় বাড়ল। কথা কমল।
মিতা প্রশ্ন করলে বলত, “তুমি এত প্রশ্ন করো কেন?”
“আগেও তো করতাম।”
“আগের কথা বারবার বলো না।”
মিতার কাছে এই কথাটাই অদ্ভুত লাগত। আগের কথা ছাড়া তাদের বর্তমানটা এলো কোথা থেকে?
এক রাতে খাবার টেবিলে বাচ্চা জিজ্ঞেস করল, “তোমরা আজকাল কথা বলো না কেন?”
দুজনই চুপ।
মিতা হাসার চেষ্টা করল। “আমরা তো কথা বলছি।”
বাচ্চা বলল, “না।”
শিশুরা অনেক কিছু বুঝে ফেলে। শুধু সবকিছুর নাম জানে না।
একদিন রাশেদ বলল, “তুমি দোকানে কম আসো।”
“কেন?”
“আমি একাই পারি এখন।”
“আমি তো সাহায্য করি।”
“দরকার নাই।”
এই দোকানে মিতার টাকা আছে। সময় আছে। ঘুম না হওয়া রাত আছে। তারপরও একটা কথায় সব যেন মুছে গেল।
দরকার নাই।
কয়েক সপ্তাহ পর ব্যাংকের একটা কাগজ নিয়ে কথা উঠল।
মিতা বলল, “আমাকে দেখাও।”
রাশেদ বিরক্ত হলো। “সব তোমাকে দেখাতে হবে?”
“আমাদের জিনিস হলে দেখাবে।”
রাশেদ বলল, “সবকিছু আমাদের না।”
কথাটা বলার পর ঘরটা খুব চুপ হয়ে গেল।
দশ
সেই রাতে মিতা ঘুমাতে পারেনি। একটা প্রশ্ন প্রথমবার তার মাথায় এল।
যে সংসারকে সে নিজের মনে করেছে, কাগজে সেখানে তার নাম কতটুকু? যে ব্যবসায় নিজের সঞ্চয় দিয়েছে, তার অধিকার কতটুকু? আর যে শিশুকে সে বুকের ভেতর নিজের সন্তান বানিয়েছে, কাগজপত্রের হিসাবে তার অবস্থান কোথায়?
ভালোবাসার সময় মানুষ কাগজপত্র দেখে না। সমস্যা শুরু হলে কাগজই তাকে নিজের জায়গা চিনিয়ে দেয়।
রাশেদের দূরত্ব বাড়তে লাগল। কখনো কথা বন্ধ। কখনো উপেক্ষা। কখনো পরিচিতদের সামনে ছোট করে কথা বলা।
মিতা প্রতিবাদ করলে বলত, “তুমি বেশি সেনসিটিভ।”
একদিন মিতা সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আর আমাকে পছন্দ করো না?”
রাশেদ ফোন থেকে চোখ না তুলে বলল, “এখন এসব কথা ভালো লাগে না।”
“তাহলে কোন কথা ভালো লাগে?”
কোনো উত্তর এলো না।
কখনো কখনো উত্তর না দেওয়াটাও খুব পরিষ্কার উত্তর।
তারপর এক সন্ধ্যায় রাশেদ প্রায় স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমার মনে হয় আমরা আর একসঙ্গে থাকতে পারব না।”
মিতা তাকিয়ে রইল। “কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“কিছু না হলে মানুষ সংসার ভাঙে?”
রাশেদ চুপ।
মিতা বলল, “বাচ্চা?”
“বাচ্চা আমার সঙ্গে থাকবে।”
“কী বললে?”
“ও আমার সন্তান।”
কথাটা রক্তের হিসাবে সত্যি। আর কাগজপত্রের হিসাবে মিতার নিজের অবস্থান যে কতটা দুর্বল, সেটা সে তখনই প্রথম টের পেল।
ও আমার সন্তান।
তাহলে এত বছরের জ্বরের রাত কার? স্কুল থেকে ফোন এলে যে ছুটে গেছে, সে কে? প্রথম “মা” ডাকটা কার ছিল? লাঞ্চবক্স? ওষুধ? রাত জাগা? প্রথম হাঁটা?
কোন হিসাবের খাতায় যাবে এসব?
ভালোবাসার কোনো রসিদ থাকে না। তাই হয়তো বিচ্ছেদের সময় সেটা দেখানোও যায় না।
এগারো
ডিভোর্স হয়ে গেল। কাগজে কয়েকটা সই। কিছু বৈঠক। কিছু হিসাব। কিছু তর্ক।
মিতা যে পরিমাণ টাকা ব্যবসায় দিয়েছিল, তার সবকিছু আর সেভাবে ফিরে পেল না। ব্যবসাটাও তার থাকল না।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশুটিও বাবার সঙ্গেই চলে গেল।
প্রথম দিন খালি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মিতা। বিছানার পাশে পুরোনো স্টিকার। টেবিলে পেন্সিলের দাগ। দেয়ালে শিশুর আঁকা ছবি। এক কোণে একটা খেলনা পড়ে আছে।
সবকিছু আছে।
শুধু মানুষটা নেই।
পরে মিতা শুনল, রাশেদ আবার বিয়ে করেছে।
এক পরিচিত মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ঠিক আছো?”
মিতা বলল, “হ্যাঁ।”
মানুষের কিছু “হ্যাঁ” আসলে উত্তর না। দরজা। ওই দরজার পেছনে অনেক কিছু আটকে থাকে।
মিতা আবার একটা ছোট বাসা নিল। একা।
প্রথম দিন বাজার করে আনল এক প্যাকেট দুধ, ছয়টা ডিম, একটা ছোট পাউরুটি।
ফ্রিজে রাখতে গিয়ে হঠাৎ বুঝল, একজন মানুষের ফ্রিজ ভরতে খুব বেশি কিছু লাগে না।
আগে দুধ শেষ হয়ে যেত। জুস শেষ হতো। ইয়োগার্ট শেষ হতো। পানির বোতল খালি হতো।
সংসারে সবকিছু দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
এখন কিছুই সহজে ফুরায় না। দুধ থাকে। ডিম থাকে। পাউরুটি থাকে। কেউ খায় না।
কোনো কোনো সময় জিনিস থেকে যাওয়াটাও শূন্যতার প্রমাণ।
একদিন পুরোনো একটা বাক্স গোছাতে গিয়ে মিতা ছোট্ট একটা মোজা পেল। সাদা রঙ। নীল দাগ। শিশুটির একদম ছোটবেলার মোজা। হাতের তালুর চেয়েও ছোট।
মিতা মেঝেতে বসে পড়ল।
একসময় এই মোজা হারালে সে পুরো ঘর খুঁজত। বিছানার নিচে। লন্ড্রি ব্যাগে। সোফার পাশে।
তখন শিউলি থাকলে হয়তো বলত, “তুই পাগল হয়ে গেছিস।”
মিতা বলত, “তোর বাচ্চা, তুই খুঁজ।”
তারপর দুজন হাসত।
এখন শিউলি নেই। শিশুটিও নেই।
মোজাটা আছে।
জীবনে কখনো কখনো সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিসটাই থেকে যায়। আর যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি দরকার, সে থাকে না।
মিতা মোজাটা ফেলে দিল না। ছোট একটা বাক্সে রেখে দিল। তারপর জানালার পাশে গিয়ে বসে রইল।
বাইরে কুইন্সের রাস্তা দিয়ে মানুষ বাড়ি ফিরছে। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ। কেউ ফোনে কথা বলছে। কোনো একটা অ্যাপার্টমেন্টের জানালায় বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও রান্নাঘরের আলো জ্বলছে।
চারপাশে কত ঘর। কত সংসার।
মিতা অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল।
তারও তো একটা ঘর ছিল।
অন্তত সে তাই ভেবেছিল।
শেষ পর্যন্ত শুধু বুঝতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।
যে ঘরটাকে সে নিজের ভেবেছিল, সেই ঘরটা আসলে কোনোদিনই পুরোপুরি তার ছিল না।
07/11/2026
৪২০টি চাকরির আবেদন, ৪২০টি প্রত্যাখ্যান, মাত্র ৩টি সাক্ষাৎকার। তারপরও থেমে যাননি। শেষ পর্যন্ত তিনি পৌঁছেছেন নিজের স্বপ্নের চাকরিতে।
এই গল্পটি শুধু একজন মানুষের সাফল্যের গল্প নয়, বরং ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার গল্প।অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসা অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর বাস্তবতাও প্রায় একই। ডিগ্রি শেষ করেও মাসের পর মাস চাকরি মিলছে না। শত শত আবেদন করেও কোনো উত্তর আসে না। এতে হতাশ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এখানেই অনেকেই সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন—চেষ্টা বন্ধ করে দেন।
কেন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চাকরি পান না?
১. অস্ট্রেলিয়ান স্টাইলের CV ও Cover Letter না থাকা
একটি সাধারণ CV দিয়ে শত শত আবেদন করলেও ফল পাওয়া কঠিন। প্রতিটি চাকরির জন্য CV ও Cover Letter আলাদাভাবে সাজাতে হয়।
২. ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি
যোগ্যতা থাকলেও Interview-তে নিজের দক্ষতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতে না পারলে সুযোগ হাতছাড়া হয়।
৩. Australian Experience-এর অভাব
অনেক নিয়োগকর্তা স্থানীয় কাজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেন। তাই শুরুতে পার্ট-টাইম, ভলান্টিয়ারিং বা ইন্টার্নশিপও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
৪. Networking না করা
অস্ট্রেলিয়ায় অনেক চাকরি প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপনই হয় না। LinkedIn, Professional Events এবং পরিচিতির মাধ্যমে অনেক সুযোগ তৈরি হয়।
৫. ভুল জায়গায় আবেদন করা
যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং ভিসার শর্তের সঙ্গে মিল না থাকা চাকরিতে আবেদন করলে প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনাই বেশি।
কী করলে সুযোগ বাড়বে?
✅ প্রতিটি চাকরির জন্য CV ও Cover Letter কাস্টমাইজ করুন।
✅ LinkedIn প্রোফাইল পেশাদারভাবে তৈরি করুন এবং নিয়মিত আপডেট রাখুন।
✅ Interview-এর জন্য অনুশীলন করুন।
✅ প্রয়োজনে ছোট বা Entry-level চাকরি দিয়ে শুরু করুন।
✅ দক্ষতা বাড়াতে Short Course বা Certification করুন।
✅ ধৈর্য ধরে নিয়মিত আবেদন চালিয়ে যান।
মনে রাখবেন, প্রত্যাখ্যান মানেই আপনি অযোগ্য নন। অনেক সময় সঠিক সুযোগটি পেতে শত শত আবেদনও করতে হয়। একজন মানুষ ৪২০ বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও যদি সফল হতে পারেন, তাহলে আপনারও পরবর্তী আবেদনটি হয়তো আপনার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।হাল ছাড়বেন না। আপনার পরিশ্রম, দক্ষতা এবং ধৈর্যই একদিন আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠবে।
New York to Oklahoma
04/24/2026
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বড় সিদ্ধান্ত,
৭০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল পাস করল সিনেট—
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট, আইস এবং বর্ডার পেট্রোলের জন্য একটি বাজেট পরিকল্পনা পাস করেছে মার্কিন সিনেট। রিপাবলিকানদের এই উদ্যোগটি ডেমোক্র্যাটদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও পাস হয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য এটি হাউসে পাঠানো হয়েছে।
ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুইজন বিক্ষোভকারী নিহতের ঘটনায় ডেমোক্র্যাটরা নীতিগত পরিবর্তনের দাবি তোলায় গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে পুরো হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগটি বন্ধ রয়েছে।
সিনেটের এই ভোটাভুটি শুরু হয় স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা থেকে এবং তা চলে বৃহস্পতিবার ভোররাত পর্যন্ত। রিপাবলিকানরা এই অর্থায়নের জন্য বাজেট রিকনসিলিয়েশন বা বাজেট সমন্বয় নামক একটি বিশেষ এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করছেন।
এই প্রক্রিয়ার সুবিধা হলো, সিনেটে সাধারণত যেকোনো বিল পাসের জন্য ৬০টি ভোটের প্রয়োজন হলেও এতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা কেবল ৫১টি ভোট পেলেই চলে। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা ৫৩টি, যা এই বাজেট পাসে সহায়ক হয়েছে।
সিনেট মেজরিটি লিডার জন থিউন এই সিদ্ধান্তের পক্ষে বলেন, এর মাধ্যমে আমেরিকার সীমান্ত সুরক্ষিত হবে। অন্যদিকে সিনেট মাইনরিটি লিডার চাক শুমার এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, আইস বা বর্ডার পেট্রোলের পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ কমানোর দিকে রিপাবলিকানদের বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Contact the business
Telephone
Address
New York, NY
Alerts
Be the first to know and let us send you an email when SOBUJ USA posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.
